বড়লোকের শখের ফিশ এখন দেশি মাছের ভয়াবহ হুমকি

অ্যাকুরিয়াম থেকে গুলশান লেক হয়ে দেশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়া দক্ষিণ অ্যামেরিকার ‘সাকারমাউথ ক্যাট ফিশ’ বা ‘সাকার ফিশ’ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিজ্ঞানীরা৷

 

অ্যাকুরিয়াম থেকে গুলশান লেক হয়ে দেশের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়া দক্ষিণ অ্যামেরিকার ‘সাকারমাউথ ক্যাট ফিশ’ বা ‘সাকার ফিশ' নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন বিজ্ঞানীরা৷
ছবি: Sheikh Ferdoush Ahmed

দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে এই মাছের উপস্থিতি উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে৷

বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, সাকার ফিশ এভাবে বাড়তে থাকলে দেশের মিঠা পানির মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে৷ আর হালদা নদীতে কার্প জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক ডিম উৎপাদন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে৷ তাই তারা এই মাছ নির্মূলে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলেছেন৷ তাদের মতে, সাকার মাছ অন্য দেশি মাছের খাবার খেয়ে ফেলে এবং অবাসস্থল দখল করে৷ বাংলাদেশের মানুষ এ মাছ না খাওয়ায় তারা দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে এবং যেকোনো পরিবেশে টিকে থাকে৷

‘হালদার জন্য সাকার মাছ নতুন হুমকি তৈরি করছে’

হালদা নদীর জেলে কামাল সওদাগর জানান, গত বছর থেকে তারা জাল ফেললে সাকার মাছ পাচ্ছেন৷ নদীর কয়েকটি এলাকায় এই মাছের উপস্থিতি খুব বেশি৷ এভাবে চলতে থাকলে মাছের প্রাকৃতিক ডিম কমতে থাকবে বলে মনে করেন তিনি৷ বিষয়টি জেলেরা মৎস্য অধিদপ্তরকে জানিয়েছে বলে জানান তিনি৷

রিভার এন্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ জানান, ‘‘হালদা নদীতে আট ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের সাকার মাছও পাওয়া গেছে৷ এটা ১৮-২০ ইঞ্চিও হয়৷ আমরা ধারণা করি আরো বড় সাকার মাছ ওই নদীতে আছে৷’’

মৎস্যবিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত ১০ বছর ধরেই বাংলাদেশের জলাশয়ে সাকার মাছ পাওয়া যাচ্ছে৷ এই অ্যাকুরিয়াম ফিশটি গুলশান লেক থেকে ছড়িয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে৷ এখন এটা নদী ও পুকুরে ছড়িয়ে পড়েছে৷ সবচেয়ে বেশি সাকার মাছ পাওয়া যাচ্ছে বুড়িগঙ্গা এবং তুরাগ নদীতে৷ মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘‘বুড়িগঙ্গা এবং তুরাগে জেলেরা জাল ফেললে সাকার মাছে জাল ভরে ওঠে৷ অন্য কোনো মাছ পাওয়া যায় না৷” তারা দূষিত পানিতেও টিকে থেকে বংশবৃদ্ধি করে৷ বুড়িগঙ্গা ও তুরাগে যে দেশি মাছ পাওয়া যেত তা এখন আর পাওয়া যায় না বলে জানান তিনি৷

বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে ‘সাকারমাউথ ক্যাটফিশ’
বাংলাদেশের বিভিন্ন নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে ‘সাকারমাউথ ক্যাটফিশ’     ছবি: Sheikh Ferdoush Ahmed

সাকার মাছ নিয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক কাজ করছেন৷ গবেষণা দলের প্রধান ফিশারিজ বায়োলজি এবং জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব বলেন, ‘‘আম্যাজোন অঞ্চলের এই মাছটির যেকোনো পরিবেশে টিকে থাকা ও বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা আছে৷ এরা অন্য মাছের আশ্রয়স্থল দখল এবং খবার খেয়ে ফেলে৷ আর নদী বা জলাশয়ের তলদেশে থাকে বলে সেখানে অন্য মাছের খাবার খেয়ে ফেলে, আবাস দখল করে৷ আমাদের দেশের মানুষ এই মাছটি যেহেতু খায় না তাই এরা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে দেশীয় মাছকে হটিয়ে দিচ্ছে৷’’

তিনি বলেন, ‘‘এই মাছটির সারা শরীরের কাঁটা৷ সামনে ও পিঠে বড় কাঁটা ৷ ফলে অন্য মাছকে সহজেই হটিয়ে দিয়ে টিকে থাকে৷’’

এই মাছ এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নদী এমকি পুকুরেও ছড়িয়ে পড়েছে৷ এরা পানি ছাড়াও কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা বেঁচে থাকে বলে জানান তিনি৷

‘মাছটি দেখতে খারাপ হলেও সুস্বাদু’

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, ‘‘এই মাছ মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর এখনো তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি৷ তবে কেউ খায় না বলে এই মাছ দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করছে৷ ফলে দেশীয় প্রজাতির মিঠা পানির মাছের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে৷ হালদা নদী দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতি মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র৷ এখানে কার্প জাতীয় মাছ নির্দিষ্ট সময়ে ডিম দেয়৷ আর সেই ডিম সংগ্রহ করে জেলেরা বিক্রি করে৷ এ থেকে মাছের পোনা উৎপাদন হয়৷ এমনিতেই হালদা নানা কারণে হুমকির মুখে৷ এখন এই সাকার মাছ নতুন হুমকি তৈরি করছে৷ দেশীয় মাছ টিকতে না পারলে হালদায় ডিম উৎপাদন হবে না৷’’

দেশের মিঠা পানির মাছ রক্ষায় তাই এই সাকার মাছ নির্মূলে জেলেদের কাজে লাগানোর কথা বলছেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা৷ এই মাছ ধরার পড়ার পর মেরে ফেলতে হবে, আবার জলাশয়ে ছেড়ে দেয়া যাবে না৷ এজন্য জেলেদের আর্থিক প্রণোদনা দেয়া যেতে পারে৷ দরকার ব্যাপক প্রচার৷ অধ্যাপক ড. কাজী আহসান হাবীব বলেন, ‘‘এই মাছ দিয়ে ফিশ ফিডও বানানো সম্ভব৷ সেটার জন্য উদ্যোগ নিতে হবে৷ মোট কথা হল এর প্রজনন ব্যালেন্স করতে হবে৷’’

রুপ ও গুণের হালদা নদী

তবে রিভার এন্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ মনে করেন, ‘‘এর বাইরে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করেও এর বিস্তার রোধ সম্ভব৷ এই মাছটি দেখতে খারাপ হলেও সুস্বাদু৷ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নয়৷ আমরা নিজেরা রান্না করে খেয়ে দেখেছি৷ তবে এটা প্রসেস করা কঠিন৷’’

ড. মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, ‘‘আমি শুরু থেকেই ব্যক্তিগতভাবে জেলেদের মাছটির ব্যাপারে সতর্ক করছি৷ এখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য কর্মকর্তাদের মাধ্যমে  জেলেদের বলা হচ্ছে৷ তবে আরো প্রচার দরকার৷’’

তিনি বাংলাদেশে অ্যাকুরিয়াম ফিশের ব্যাপারে নীতিমালারও দাবি করেন৷ তার কথা, ‘‘এটা অ্যাকুরিয়াম থেকে ছড়িয়েছে৷ কিন্তু বিদেশি কোনো মাছ, প্রাণী বা গাছ যাই এদেশে আনা হোক না কেন তার একটা নীতিমালা থাকা দরকার৷ কোয়ারান্টিনের বিধান থাকা দরকার৷ আগে দেখা দরকার ওই মাছ বা প্রাণী আমাদের পরিবেশের উপযোগী কী না৷’’

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি বিদেশ থেকে আকাশমণি গাছ এনেছিলেন যা আমাদের পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর৷ আমি পিরানহা মাছের বিরোধিতা করে শোকজ খেয়েছিলাম৷ যদিও পরে সেই মাছ নিষিদ্ধ হয়৷’’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *